Close

বিএনপির ইশতেহারে ঐক্যফ্রন্টের দাবি

বিশেষ প্রতিবেদন: একাদশ জাতীয় নির্বাচনে অংশ নেয়ার প্রস্তুতি হিসেবে নিরপেক্ষ সরকারের দাবিতে আন্দোলনের পাশাপাশি নির্বাচনী ইশতেহার তৈরির কাজ করছে বিএনপি। ২০১৭ সালের ১০ মে রাজধানীর হোটেলে ঘোষণা দেয়া ভিশন ২০৩০-এর আলোকে এই ইশতেহার তৈরি হচ্ছে। তবে বিএনপির এই ইশতেহারে নবগঠিত জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের ৭ দফা দাবি ও ১১ লক্ষ্যের প্রতিফলনও থাকছে বলে জানা গেছে। নির্বাচনে অংশ নেয়ার চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত যখন আসবে, তখন আনুষ্ঠানিকভাবে এ ইশতেহার ঘোষণা করবে দলটি।

উল্লেখ্য, দেশ পরিচালনা, সুখী সমৃদ্ধ ক্ষুধা-দারিদ্র্য মুক্ত এবং জনগণের মালিকানায় আধুনিক ও উন্নত বাংলাদেশ গড়তে ৩৭টি বিষয়কে গুরুত্ব দিয়ে রুপকল্প ‘ভিশন-২০৩০’ ঘোষণা করেছিলেন বিএনপি চেয়ারপার্সন বেগম খালেদা জিয়া। ১৩ অক্টোবর আত্মপ্রকাশের দিন ৭ দফা দাবি ও ১১ দফা লক্ষ্য ঘোষণা করে জাতীয় ফ্রন্ট।

অপরদিকে বিএনপির ইশতেহারেও ঐক্যফন্ট্রের ১১ লক্ষ্য থাকতে পারে বলে জানিয়েছেন দলটির ২ ভাইস-চেয়ারম্যান। তারা বলেন, আমরা দুই ধরনের ইশতেহার তৈরিতে হাত দিয়েছি। প্রয়োজনে সংযোজন, সংশোধন বা কর্তন করা হবে। তবে ইশতেহারে বেশিরভাগই রয়েছে আওয়ামী লীগ সরকারের ব্যর্থ প্রকল্পগুলোকে সফল করার প্রতিশ্রুতি। দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের নির্দেশে জাতীয়তাবাদী ঘরানার দক্ষ সাবেক আমলা, আইন বিশেষজ্ঞ, পুলিশের সাবেক কর্মকর্তা, সেনা, শিক্ষা, কৃষি, শিল্প, পরিবেশ গবেষণা, বেসরকারি বিনিয়োগ, শিল্পায়ন, পোশাক খাত, শ্রমবাজার উন্নয়ন, বৈদেশিক সম্পর্ক বিষয়ে অভিজ্ঞ ব্যক্তিদের মতামত নিয়ে একটি খসড়া ইশতেহার তৈরির কাজ চলছে। যা আরো যাচাই-বাছাই করে চ‚ড়ান্ত করা হবে। তবে ‘ভিশন-২০৩০’-এর আলোকে নির্বাচনী ইশতেহার তৈরি হচ্ছে।

ইশতেহারে নতুন ধারা সরকারের পরিকল্পনা সামনে রেখে মেধার পরিপূর্ণ ব্যবহারের জন্য চাকরি ক্ষেত্রে কোটা কমিয়ে আনা, প্রশাসন ও বিচার বিভাগের দলীয়করণের অবসানের বিষয়ে বলা হয়েছে। এ ছাড়া বিভক্তি ও বিভাজনের রাজনীতি পরিবর্তনে অহিংস নীতি গ্রহণের সর্বাধিক গুরুত্ব দেয়া হয়েছে খসড়া নির্বাচনী ইশতেহারে। তবে আগামী নির্বাচনী বিএনপির স্লোগান কি হবে তা এখনো চ‚ড়ান্ত করা হয়নি। এবার একটি আকর্ষণীয় স্লোগান হবে বলে জানা গেছে।

অন্যদিকে আন্দোলন ও নির্বাচন দুটিরই প্রস্তুতি রাখতে বিএনপি দলটির তৃণমূলের নেতাকর্মীদের নির্দেশনা দিয়েছে। নির্বাচনে অংশ নেবে কি নেবে না, সে সিদ্ধান্ত এখনো চ‚ড়ান্ত করেনি বিএনপি। তবে ভিশন-২০৩০-এর আলোকে নির্বাচনী ইশতেহার তৈরির পাশাপাশি দলের সম্ভাব্য প্রার্থীর তালিকার খসড়াও করে রেখেছে বিএনপি। এর উদ্দেশ্য হলো নির্বাচনে অংশ নিতে গেলে প্রার্থী তালিকা চ‚ড়ান্ত করতে যাতে হিমশিম খেতে না হয়। বিএনপির শীর্ষ নেতাদের সঙ্গে কথা বলে দলের এ অবস্থানের কথা জানা গেছে।

বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেন, বিএনপি মূলত আন্দোলনে আছে। কারণ দলের চেয়ারপার্সন খালেদা জিয়ার মুক্তি ছাড়া জনগণ এই নির্বাচন গ্রহণ করবে না। দ্বিতীয়ত, বিএনপির মতো বড় দলে সব সময়ই নির্বাচনের প্রস্তুতি থাকে এবং এখনো আছে। ফখরুল বলেন, আন্দোলন ও নির্বাচন দুটিতেই বিএনপি আছে এটি বলা যায়। তবে নির্বাচনের জন্য প্রয়োজনীয় পরিবেশ সৃষ্টি না হলে জনগণ আন্দোলনকেই বেছে নেবে।

দলটির একাধিক সূত্র জানিয়েছে, বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের নির্দেশে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরীর তত্ত¡াবধানে বিএনপির নির্বাচনী ইশতেহার তৈরির কাজও প্রায় শেষ পর্যায়ে। ভিশন-২০৩০-এর আলোকে ওই ইশতেহার তৈরি করছেন। তবে জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট গঠিত হওয়ায় এখন ফ্রন্টের ১১ দফা লক্ষ্য ওই ইশতেহারে অন্তর্ভুক্ত করা হবে। ইশতেহার তৈরির সঙ্গে যুক্ত এমন এক নেতা জানান, একসঙ্গে নির্বাচন করলে অবশ্যই ওই লক্ষ্যগুলোর সঙ্গে সমন্বয় করে ঐক্যফ্রন্টের ইশতেহার তৈরি হবে। নাম প্রকাশ না করার শর্তে এ নেতা বলেন, ভিশন-২০৩০ নামের এক রূপকল্পে ৩৭টি বিষয় বা ইস্যুতে মোট ২৫৬ দফা প্রতিশ্রুতি ঘোষণা করে বিএনপি। এর মধ্যে প্রধানমন্ত্রীর একক ক্ষমতা কমিয়ে সরকারের নির্বাহী ক্ষমতায় ভারসাম্য আনা এবং দ্বিকক্ষ বিশিষ্ট সংসদ প্রতিষ্ঠাসহ ইতিবাচক অনেক বিষয়ের কথা উল্লেখ করা হয়। ১৩ অক্টোবর বিএনপির সঙ্গে অন্য ৩টি দলের সমন্বয়ে গঠিত জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের ঘোষিত ১১ দফা লক্ষ্য পর্যালোচনা করে দেখা গেছে, রাষ্ট্রপতি ও প্রধামন্ত্রীর মধ্যে ক্ষমতার ভারসাম্য আনা, প্রশাসন বিকেন্দ্রীকরণ ও ন্যায়পাল নিয়োগ, সন্ত্রাস ও জঙ্গিবাদের বিরুদ্ধে জাতীয় ঐকমত্য গঠনসহ আরো অনেক প্রতিশ্রুতি রয়েছে। এসব প্রতিশ্রুতিও থাকছে বিএনপির ইশতেহারে। এসব বিষয়গুলো হচ্ছে আ স ম রব ও ড. কামালের দীর্ঘদিনের ক্ষমতায় যাওয়ার প্রতিশ্রুতি। বিএনপির সঙ্গে ঐক্যফ্রন্টের ফলে গুরুত্বের সঙ্গে নিচ্ছে বিএনপি নেতারাও।

ইশতেহারে আরো রয়েছে, পোশাক কর্মীদের আলাদা বেতন কাঠামো, কর্মপরিবেশ এবং নিরাপত্তা বিষয়গুলো গুরুত্ব দেয়া হয়েছে। তৈরি পোশাক খাতের জন্য আলাদা মন্ত্রণালয় প্রতিষ্ঠা, শিল্পোদ্যোক্তাদের প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণ এবং সরকারি প্রণোদনা দেয়া, কক্সবাজারে একটি সিলিকন বিচ সিটি কিংবা সুন্দরবনকে ঘিরে ওয়াটার বেজ সাফারি নির্মাণ, ঢাকার চারপাশের এলাকার সঙ্গে দ্রুতগতির রেল লাইন নির্মাণ, স্যাটেলাইট সিটি তৈরি, বিকেন্দ্রীকরণ এবং নগরায়ন, আরেকটি সাবমেরিন ক্যাবল বসানোর পাশাপাশি ইন্টারনেট ব্যবহারের খরচ কমিয়ে এটিকে আরো সহজলভ্য করা, একটি আইটি পার্ক স্থাপন, দেশে কমপক্ষে ২৫ ভাগ বনায়ন নিশ্চিত করতে কমপক্ষে ৫ কোটি বৃক্ষরোপণ করার বিষয়টিও ইশতেহারের খসড়ায় স্থান পাচ্ছে। এ ছাড়া দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্ব গতিরোধ, আইনশৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠা ও সন্ত্রাস দমন, স্বাস্থ্য বীমা চালু, মন্ত্রী-এমপিদের সম্পদের হিসাব বিবরণী প্রকাশ, দেশের উন্নয়ন ও জনকল্যাণে বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ নেয়ার কথা থাকছে।

আর ইশতেহার তৈরির পাশাপাশি বিএনপির গঠনতন্ত্র অনুযায়ী দলের স্থায়ী কমিটির মনোনয়ন বোর্ডের সদস্যরা দলীয় প্রার্থী চ‚ড়ান্ত করেন। প্রতিটি আসনে আগ্রহী প্রার্থীর সাক্ষাৎকারের সময় সংশ্লিষ্ট জেলার সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদককে বোর্ডে ডাকা হয়। তবে এবার সমস্যা হলো, নির্বাচনের আগে মুক্তি না মিললে দলের চেয়ারপার্সন খালেদা জিয়া ও ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান বোর্ডে উপস্থিত থাকতে পারছেন না। এ ছাড়া আরো কিছু কারণে বিএনপি নির্বাচনে অংশগ্রহণের ব্যাপারে এখনো এক ধরনের দোটানায় রয়েছে। ফলে কেন্দ্র থেকে নির্বাচনে অংশগ্রহণের বিষয়ে সুস্পষ্ট কোনো বার্তা এখনো দেয়া হয়নি বলে নেতাদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়। তবে তারা বলেন, সারাদেশের জেলা, উপজেলা ও পৌর বিএনপি নেতাদের কাছে সম্প্রতি আন্দোলন ও নির্বাচন একসঙ্গে চলবে বলে কৌশলগত এই দুই নির্দেশনা গেছে।

বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবীর রিজভী আহমেদ বলেন, নিরপেক্ষ সরকার, সংসদ ভেঙে দিয়ে নির্বাচন এবং দেশনেত্রী খালেদা জিয়ার মুক্তির দাবিতে আমরা আন্দোলনে আছি। তবে বিএনপি একটি বৃহত্তম দল এবং অনেকবার নির্বাচনে অংশ নিয়েছে। ফলে প্রস্তুতি এমনিতেই আছে।

দলের একাধিক সূত্র জানায়, নির্বাচনে সম্ভাব্য এজেন্টদের একটি তালিকা করতে লন্ডন থেকে মৌখিক নির্দেশ দিয়েছেন তারেক রহমান। তালিকাটি খুবই গোপন ও সতর্কতার সঙ্গে করতে বলেছেন তিনি। কারণ বিএনপির কাছে খবর আছে, বিগত উপজেলা, পৌরসভা ও সিটি কর্পোরেশন নির্বাচনে বিএনপির এজেন্টদের তালিকা ধরে ধরে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী গ্রেফতার করছে। এ ছাড়া বিএনপির কেন্দ্রীয় কার্যালয় থেকে কিছু দিন আগে দেয়া এক চিঠিতে প্রতিটি উপজেলা, পৌরসভা ও জেলা থেকে বিএনপি দলীয় ২ জন করে নির্বাচনী এজেন্টের নাম দেয়া হয়েছে, যাদের প্রশিক্ষণ দিয়েছে যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক অলাভজনক বেসরকারি সংস্থা এনডিআই (ন্যাশনাল ডেমোক্র্যাটিক ইনস্টিটিউট)।

এ প্রসঙ্গে বিএনপির যুগ্ম মহাসচিব ও নরসিংদী জেলা বিএনপির সভাপতি খায়রুল কবীর খোকন বলেন, কেন্দ্র থেকে আন্দোলন ও নির্বাচন দুটিরই প্রস্তুতি রাখতে বলা হয়েছে। সে অনুযায়ী কাজ করছি। নির্বাচনী এজেন্টের প্রশিক্ষণের জন্য এনডিআইয়ের প্রস্তাব অনুযায়ী লোক পাঠানোর কথাও স্বীকার করেন খোকন।

এদিকে আন্দোলনের পাশাপাশি নির্বাচনী ইশতেহার ও প্রার্থী  ‍চূড়ান্ত তালিকা করতে একটি বিশেষ টিমও গঠন করা হয় দলটির পক্ষে থেকে। তবে বেশিরভাগ নেতাই এখন নির্বাচনমুখী। যদিও তারা প্রকাশ্যে নির্বাচনে অংশ না নেয়ার জন্য অবিরাম বলে যাচ্ছেন। এক শীর্ষ নেতা বলেন, নির্বাচনে না গেলে দলের সাংগঠনিক কার্যক্রম শক্তিশালীর পরিবর্তে দুর্বল হয়ে পড়বে।

Share on Facebook
নিউজটি 83 বার পড়া হয়েছে

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

সর্বশেষ সংবাদ

16129961_1730814400566375_1235166755_o