Close

খালেদা জিয়ার মামলার রায়কে ঘিরে রাজনৈতিক উত্তাপ

জিয়া এতিমখানা দুর্নীতি মামলার রায় ঘোষণা নিয়ে উত্তেজনা দেখা দিয়েছে। উত্তপ্ত রাজনীতি। রায়কে কেন্দ্র করে মুখোমুখি অবস্থানে দাঁড়িয়েছে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ ও তাদের প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী বিএনপি। পাল্টাপাল্টি হুশিয়ারি দিয়েছেন দল দুটির নেতারা। এ নিয়ে সতর্ক অবস্থানে সরকারও। রায়ে দলের চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার সাজা হলে দেশে ‘প্রলয়কান্ড’ ঘটবে বলে হুশিয়ারি দিয়েছে বিএনপি। জবাবে রায় ঘিরে কেউ ‘বিশৃঙ্খলা বা ধ্বংসাত্মক কার্যকলাপের’ চেষ্টা করলে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ‘প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা’ নেবে বলে পাল্টা হুশিয়ার করেছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল। এমনকি আওয়ামী লীগ নেতারা জনগণকে সঙ্গে নিয়ে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টিকারীদের প্রতিহত করার ঘোষণা দিয়েছেন। এজন্য ক্ষমতাসীনদের প্রয়োজনীয় সাংগঠনিক প্রস্তুতি রয়েছে বলেও জানিয়েছেন নেতারা।

আগামী ৮ ফেব্রুয়ারি সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার বিরুদ্ধে বিদেশ থেকে জিয়া এতিমখানা ট্রাস্টের নামে আসা দুই কোটি ১০ লাখ টাকা আত্মসাতের এ মামলার রায় ঘোষণা করা হবে। এ মামলায় দুই পক্ষের যুক্তিতর্ক শুনানি শেষে গত বৃহস্পতিবার ঢাকার পঞ্চম বিশেষ জজ মো. আখতারুজ্জামান রায়ের এই দিন ধার্য করেন। সেদিন থেকেই উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে দেশে। গতকাল তা আরো প্রকট আকার ধারণ করে।

খালেদা জিয়ার বিরুদ্ধে এই দুর্নীতি মামলার রায় ঘিরে নানা আলোচনা এখন ‘টক অব দ্য কান্ট্রি’। রাজনীতি ও নির্বাচনী রাজনীতিতে চলছে নানা হিসাব-নিকাশ। বিশেষ করে খালেদা জিয়ার সাজা হলে একাদশ জাতীয় নির্বাচনে বিএনপি অংশ নেবে কি না, আর অংশ না নিলে অংশগ্রহণমূলক নির্বাচনের কি হবে এ নিয়ে যেমন আলোচনা চলছে; তেমনি রায়ের বিরুদ্ধে রাস্তায় নামলে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির কি হবে, এ নিয়েও উদ্বিগ্ন সাধারণ মানুষ। আবার কি ২০১৪ সালের নির্বাচন-পরবর্তী জ্বালাও-পোড়াও কর্মসূচিতে যাবে দলটি; নাকি রাজনৈতিকভাবে মোকাবিলা করবে তা নিয়েও চিন্তিত সবাই। অন্যদিকে রায়-পরবর্তী উদ্ভুত পরিস্থিতি সরকারইবা কীভাবে সামাল দেয়, সে দিকেও তাকিয়ে সবাই। বিএনপির কর্মসূচি ঠেকাতে ক্ষমতাসীনরা কি সংঘর্ষে জড়াবে, নাকি শান্তিপূর্ণ সমাধানের পথেই হাঁটবে দুই দল; তা নিয়েও নানা জল্পনা-কল্পনা চলছে নানা মহলে।

রায়ের ভবিষ্যৎ নিয়েও বিভিন্ন আলোচনা নানা মহলে। আদতেই কি খালেদা জিয়ার সাজা হবে, নাকি খালাস পাবেন এনিয়ে পক্ষে-বিপক্ষে মত রয়েছে। সাজা হলে পরবর্তী নির্বাচনে খালেদা জিয়া অংশ নিতে পারবেন কি না; সে কথা জানতেও আগ্রহ মানুষের। কত দিনের সাজা হতে পারে, সাজা হলে কোথায় রাখা হতে পারে তাকে এনিয়েও চলছে নানা জল্পনা-কল্পনা। এমনকি নির্বাচন সামনে রেখে এ রায় হতে যাওয়ায়, এ মামলায় রাজনৈতিক গন্ধ পাচ্ছেন কেউ কেউ।

মামলা ও মামলার রায় নিয়ে পরস্পরকে দোষারোপ ও সন্দেহের চোখে দেখছে আওয়ামী লীগ ও বিএনপি। এ মামলার রায় ঘোষণার দিন ঠিক হওয়ার পর বৃহস্পতিবার এক সংবাদ সম্মেলনে বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেন, এই অবৈধ সরকার আগেই রায় লিখে রেখেছে। বিচার হবে প্রধানমন্ত্রী যা চাইবেন তাই। পরদিন গতকাল শুক্রবার বিএনপির এমন সন্দেহের জবাব দেন সরকারের সেতুমন্ত্রী ও আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের। তিনি প্রশ্ন তোলেন জিয়া এতিমখানা ট্রাস্ট দুর্নীতি মামলায় খালেদা জিয়ার সাজা হবে; এই তথ্য মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর কীভাবে জেনেছেন। এ মামলায় সরকারের কোনো হাত নেই উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘আদালত নির্দোষ করতে পারেন, আবার সাজাও দিতে পারেন। এখানে সরকারের কোনো হস্তক্ষেপ নেই। সরকার এই পর্যন্ত বিচার বিভাগে কোনো হস্তক্ষেপ করেনি।’ তিনি এমনও বলেন, মামলা তো এই সরকার দেয়নি। মামলা দিয়েছে বেগম জিয়া যাদেরকে বসিয়েছিলেন, ফখরুদ্দিন সাহেব ও তাদের সৃষ্টি মইনউদ্দীন সাহেব।

এনিয়ে উদ্বিগ্ন রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা। তাদের মতে, দেশে নির্বাচনের একটি পরিস্থিতি তৈরি হওয়ার মুহূর্তে বিএনপি চেয়ারপারসনের সাজা হলে এবং সেটিকে কেন্দ্র করে আন্দোলন শুরু হলে নির্বাচন নিয়ে জটিলতা দেখা দিতে পারে। অনেকেই মনে করছেন, খালেদা জিয়ার বিরুদ্ধে মামলাটি প্রকৃতঅর্থে রাজনীতি থেকে উদ্ভূত এবং পক্ষপাতদুষ্ট। তবে রায়ে এর প্রভাব না আসা দেশের জন্য মঙ্গলজনক এবং আমরা এমন প্রত্যাশাই করি।

এ ব্যাপারে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য অধ্যাপক এমাজউদ্দিন আহমেদ বলেন, বিষয়টি আদালতের। কিন্তু আলোচনা হচ্ছে রাজনীতিতে। কারণ এই মামলার সঙ্গে রাজনীতির গন্ধ আছে। সুতরাং রায়-পরবর্তী পরিস্থিতি মোকাবিলায় দুই পক্ষকেই সতর্ক পদক্ষেপ নিতে হবে। সংযত থাকতে হবে। এমন পরিস্থিতি তৈরি করা যাবে না, যা জাতীয় নির্বাচনে নেতিবাচক প্রভাব ফেলে।

আলোচনা যাই হোক, এ মামলার রায় ঘিরে মুখোমুখি অবস্থানে দাঁড়িয়েছে বিএনপি ও আওয়ামী লীগ। পাল্টাপাল্টি হুশিয়ারি দিয়েছেন দুই দলের নেতারা। পরিস্থিতি মোকাবিলায় সর্বশক্তি প্রয়োগের প্রস্তুতির কথা জানিয়েছে দুই দলই। বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য গয়েশ্বর চন্দ্র রায় বলেছেন, তাদের চেয়ারপারসনের মামলায় ‘নেতিবাচক’ কোনো রায় হলে তার পরিণতি ‘ভয়াবহ’ হবে। অন্যদিকে আওয়ামী লীগের প্রচার ও প্রকাশনা সম্পাদক হাছান মাহমুদ বলেছেন, খালেদা জিয়ার মামলার রায় নিয়ে দেশে আবার কোনো জ্বালাও-পোড়াও হলে তাতে বিএনপিই পুড়ে ‘ছারখার হয়ে যাবে’।

নির্বাচনের আগে বছরখানেক হাতে থাকতে ওই রায় সামনে রেখে আজকের বৈঠকটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করছেন দলের নেতারা। তবে আনুষ্ঠানিকভাবে কোনো কিছুর ঘোষণা না দিয়ে হঠাৎ করেই কিছু একটা ঘটিয়ে ফেলতে পারে বিএনপিÑএমন আভাসও দিয়েছেন দলের নীতিনির্ধারণী নেতারা। তাদের মতে, ‘এমন কিছু যে ঘটবে না; সে নিশ্চয়তা আমরা দিতে পারি না। এমনকি প্রলয়কান্ড ঘটতে পারে বলেও হুশিয়ার করে দিয়েছেন দলের কয়েক নেতা।’

বসে নেই সরকার ও আওয়ামী লীগও। দলের নীতিনির্ধারণী সূত্রমতে, সর্বোচ্চ সতর্ক অবস্থায় রয়েছে দল। প্রয়োজনে দলের নেতাকর্মীদের যেকোনো পরিস্থিতি মোকাবিলায় রাজপথে থাকার নির্দেশনাও দেওয়া হবে। তবে এ বিষয়ে খুব সতর্কভাবেই এগোতে চাইছে সরকার ও ক্ষমতাসীনরা। দলের নেতাদের ধারণা, রায় সামনে রেখে এক ধরনের অস্থির পরিস্থিতি তৈরির অপচেষ্টা করছে বিএনপি। সেই সঙ্গে বিএনপির নেতাকর্মীরা কথিত আন্দোলনের নামে রাষ্ট্রীয় সম্পদ ধ্বংসের মাধ্যমে দেশজুড়ে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টিরও ষড়যন্ত্র করছেন। এ পরিস্থিতি মোকাবিলায় প্রয়োজনীয় সাংগঠনিক প্রস্তুতি নিয়ে রাখছেন তারা।

Share on Facebook
নিউজটি 245 বার পড়া হয়েছে

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

সর্বশেষ সংবাদ

16129961_1730814400566375_1235166755_o