Close

বর্তমান ধারার তাবলীগ জামায়াত. কতটা যৌক্তিক ও ইসলাম সম্মত?

বর্তমানে ইসলাম ধর্মে নানাজনের নানা মতের উপর অনেক মতবাদ সৃষ্টি করে তার উপর আমল করার জন্য ধর্মপ্রাণ মুসলমানদের নিজেদের দলে টানা হচ্ছে। ইসলামের অতি সুক্ষ বিষয়গুলি অত্যন্ত সুকৌশলে এড়িয়ে ঈমানী শক্তি বা আকিদাগত ত্রুটির কারণে ধর্মের মাঝে বিভাজন সৃষ্টি করা হয়েছে, এখনো হচ্ছে। এদের মধ্যে এমনই এক মতাবাদ ‘তাবলীগ জামায়াত’। ১৯২৬ সালে মাওলানা ইলিয়াছ (র.) ভারতের দিল্লীর দক্ষিণে মেওয়াতী নামক স্থানে এই চিল্লা পদ্ধতি তাবলীগ শুরু করেন। এই তরীকার অনুসারীদের দেখা যায় মাথায় গাট্টি নিয়ে মসজিদে মসজিদে ঘুরে বেড়াতে। মসজিদেই খাওয়া ও ঘুমের ব্যবস্থা করে থাকেন। ৪০ দিনের সফরকে বলা হয় এক চিল্লা। এছাড়া তিন দিনের জন্যেও তারা জামায়াতে গিয়ে থাকেন। তাদের ভাষায় তারা ‘দ্বীনের পথে সময় লাগান’। এসময় ফরজ নামাজের পর কেউ একজনকে দেখা যায় তাদের বয়ান শোনার জন্য মুসুল্লীদের দাওয়াত দিতে। মসজিদে অবস্থানকালে সকালে এবং প্রায় প্রত্যেক ওয়াক্ত নামাজের পর ‘তাবলীগী নেছাফ’ অথবা ‘ফাজায়েল আমল’ বই থেকে বয়ান করা হয়। বয়ান করতে পারেন যে কেউ। প্রতিদিনই প্রায় একই বয়ান করতে শোনা যায়। আবার ঐ মসজিদে যদি কোন ব্যক্তি নামাজেও থাকে তবুও তারা উচ্চস্বরেই বয়ান করতে থাকেন। তাঁদের ভাষায়, তাঁরা মসজিদে এতেকাফের নিয়তে অবস্থান করেন। বিকালে সারিবদ্ধভাবে পাড়া-মহল্লার মুসলমানদেরকেই নামাজের দাওয়াত দিয়ে থাকেন। তাবলীগের অনুসারীরা অলী, আওলিয়া, পীর-মাশায়েকদের বিশ্বাস করেন না এবং মানেন না। দিন দিন এই তরীকার অনুসারীদের সংখ্যা ক্রমশ: বৃদ্ধি পাচ্ছে। বিশ্বের অন্যান্য দেশেও এর বিস্তৃতি ঘটছে।

ইসলাম কি বলে:
তাবলীগ শব্দের আভিধানিক অর্থ ‘কালেমার দাওয়াত’। এক্ষেত্রে এর অনুসারীরা দিয়ে থাকেন ‘নামাজের দাওয়াত’। অর্থগতভাবে বিস্তর পার্থক্য রয়েছে। একথা আমাদের অবশ্যই মানতে হবে যে, তাবলীগের মাধ্যমেই ইসলামের প্রচার ও প্রসার ঘটেছে বিশ্বব্যাপী। তবে তা কিন্তু বর্তমান ধারার তাবলীগ জামায়াতের মাধ্যমে ঘটেনি। ইসলামের প্রাথমিক যুগ পরবর্তী সময়ে ইয়ামেন, পারস্য, বাগদাদ থেকে আধ্যাতিকতায় পূর্ণতাপ্রাপ্ত ব্যক্তিগণ বিভিন্ন সময়ে এই উপমহাদেশে ইসলাম প্রচারের জন্য আসেন এবং নিজেদের ক্বলবী এবং জবানী এলেমের দ্বারা অমুসলমানদের কালেমার দাওয়াত দেন। ঐ সকল অলী, আওলিয়া, পীর-মাশায়েকদের মাধ্যমেই আস্তে আস্তে ডম, মুচি, চন্ডাল, নমসুদ্র তথা অত্যন্ত নিম্নবর্ণের হিন্দু ও অন্যান্য ধর্মাবলম্বীদের মাঝে ইসলামের দাওয়াত পৌঁছে। ক্রমান্বয়ে অমুসলিমরা ইসলাম কবুল করেন এবং ধীরে ধীরে মুসলমানের সংখ্যা বৃদ্ধি পেতে থাকে। তবে কাজটি মোটেই সহজ ছিল না। উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, ভারত বর্ষে হযরত খাজা মইনুদ্দীন হাসান চিশতী র. এবং সিলেটের হযরত শাহজালাল র. এর কথা।

খাজা মইনুদ্দীন র. যখন ভারতে আসেন তখন সেখানকার শাসক ছিলেন জালিম পৃথ্বীরাজ। এই নরাধম শাসক খাজা সাহেবের আগমনের পূর্বে হযরত মিরন র. কে সত্তর জন অনুসারীসহ শহীদ করেন। পরবর্তীকালে ১৩৪৪ সালে আধ্যাধিক শক্তিতে বলীয়ান হযরত খাজা মইনুদ্দীন হাসান চিশতী র. ভারতে আসেন এবং ইসলামের দাওয়াত দিতে থাকেন। এক পর্যায়ে পৃথ্বীরাজের পতন ঘটে, ইসলামের জয়যাত্রা অব্যাহত থাকে। সিলেটের হযরত শাহজালাল র. এর কথা আমরা প্রায় সবাই কম-বেশি জানি। সিলেটের অত্যাচারী জালিম শাসক গৌর গোবিন্দের সময় শাহজালাল ইয়েমেনী র. এর আগমন ঘটে। তার আগে অনেক বেশি চড়া মূল্য দিতে হয় হযরত সৈয়দ বুরহান উদ্দিন র. কে। গরু কোরবানী করার অপরাধে তিনি সাত দিনের শিশু পুত্র গুলজারকে চোখের সামনে শহীদ করতে দেখেন, নিজের ডান হস্ত শরীর থেকে বিচ্ছিন্ন করা হয়। এমন দৃশ্য দেখে স্ত্রীও মারা যান। সে সময়ে সিলেটে বসবাসরত ১৩জন মুসলমান অথবা ১৩টি মুসলিম পরিবারের সবাইকে হত্যা করে গৌর গোবিন্দ। পররর্বীতে অনেক ঘটনা প্রবাহের পর ইসলামের দাওয়াত দিতে আসেন হযরত শাহজালাল ইয়েমেনী র.। আর এই পথই হল ইসলামের সত্যিকারের ‘তাবলীগ’। অথচ বর্তমান প্রচলিত কাকরাইল মসজিদ কেন্দ্রীক তাবলীগের অনুসারীরা তা মানতে নারাজ।

বর্তমানের তাবলীগের প্রবক্তা হলেন, হযরত মাওলানা ইলিয়াছ র.। উনি নিজে ছিলেন তরীকতপন্থী। উনার পীর ছিলেন তৎকালীন ভারতবর্ষে শ্রেষ্ট আওলিয়া আব্দুর রশিদ গাঙ্গুয়ি র. এবং উনার কাছ থেকেই শরীয়ত ও মারেফতের তত্ত্বজ্ঞান হাসিল করেছিলেন। হযরত ইলিয়াছ র. স্বপ্নযোগে পাওয়া বর্তমান প্রচলিত তাবলীগ ১৯২৬ সালে দিল্লীর দক্ষিণে মেওয়াতী নামক স্থানে প্রচলন শুরু করেন। পরবর্তীতে ঐ স্থানে তাবলীগের কর্মকান্ড চালাতে না পেরে এর অনুসারীরা আমাদের দেশে সর্বপ্রথম ১৯৪৬ সালে বিশ্ব ইজতেমা অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয় তাবলীগের মারকাজ কাকরাইল মসজিদে। এরও আগে ১৯৪৪ সালে এদেশে তাবলীগ শুরু করেন হযরত মাওলানা আবদুল আজিজ র.। ১৯৪৮ সালে চট্টগ্রাম হাজী ক্যাম্পে ইজতেমা অনুষ্ঠিত হয়। পরের ইজতেমাটি অনুষ্ঠিত হয় দশ বছর পর ১৯৫৮ সালে নারায়ণগঞ্জের সিদ্ধিরগঞ্জে। ১৯৬৫ সালে ইজতেমা অনুষ্ঠিত হয় টঙ্গির পাগারে। পরবর্তী বছর ১৯৬৬ সালে টঙ্গির ভবেরপাড়া তুরাগ নদীর তীরে অনুষ্ঠিত হয় বিশ্ব ইজতেমা। তখন থেকে সেখানকার ১৬০ একর জায়গায় প্রতিবছর নিয়মিতভাবে অনুষ্ঠিত হচ্ছে বিশ্ব ইজতেমা। এখন প্রশ্ন হলো এই তাবলীগ মেওয়াতী থেকে টঙ্গিতে কীভাবে এলো? আর আসার কারণটাই বা কী? যেখান যার উৎপত্তি সেখানে এর বিস্তার লাভ করলো না, করলো এসে টঙ্গিতে। তাবলীগ জামায়াতের সদর দফতর দিল্লীতে থাকা সত্বেও এর বার্ষিক সমাবেশ হয় টঙ্গিতে। কথিত আছে তাবলীগ জামায়াতের মুরুব্বিদের বৈঠকে ইজতেমার স্থান নির্ধারণের জন্য নাকি লটারি হয়েছিল। সেই লটারিতে বাংলাদেশের নাম ওঠে। ঘটনাটা যদি সত্যিই হয়, তাহলে তাদের অনুসারীদের জানা দরকার লটারি পদ্ধতির মাধ্যমে এমন একটি অনুষ্ঠান নিময়িত আয়োজন করার জন্য স্থান নির্দিষ্ট করার সিদ্ধান্ত কতটা যৌক্তিক। কারণ, আল্লাহ কর্তৃক নির্ধারিত নির্দিষ্ট স্থানে নির্দিষ্ট ইবাদত বলতে আমরা শুধুমাত্র হজকেই বুঝি। এক্ষেত্রে সম্পূর্ণ ব্যক্তিগত মতবাদ অনুযায়ী আমল করার বিষয়ের প্রতি বিশ্বাস স্থাপন করা বা মানা কী একজন ইমানদারের পক্ষে আদৌ সম্ভব?

এতেকাফ ছাড়া মসজিদে খাওয়া-দাওয়া ও রাত্রি যাপন ইসলামে নিষিদ্ধ হলেও এর অনুসারীরা বলে থাকেন, তারা নফল এতেকাফের নিয়তে থাকেন। কী অদ্ভূদ যুক্তি? আমরা জানি পবিত্র রমজান মাসের শেষ নয়/দশ দিন এতেকাফের সময়। এই এতেকাফের সাথে ফরজ ইবাদত রোজার একটা সম্পর্ক আছে। এর উদ্দেশ্য হলো ‘শবে কদর’ তালাশ করা। এছাড়া এই নফল ইবাদতের সাথে সুন্নতী আমল আমল আছে। যেমন, বাসা থেকে খাবার এসে মসজিদে খাওয়া। যেটি নবীজি সা. করতেন। বলা হয়েছে, যদি কারে বাসা বা বাড়িতে কোন লোক না থাকে খাবার পৌঁছে দেবার জন্য, তাহলে এতেকাফকারী নিজে খাবার এনে মসজিদে খাবে। বর্তমান এতেকাফধারীরা এক জেলা থেকে অন্য জেলায় এতেকাফ করেন। বোঝা যায়, এর সাথে ঐ যুক্তি অবশ্যই ঠিক না। আর সবচেয়ে বড় কথা হলো, মসজিদ আল্লাহ ঘর, এর নক্শা আল্লাহ প্রদত্ত, এখানে অবস্থানের নিয়ম-কানুন সবই আল্লাহ পাকের দেয়া। সেখানে আল্লাহ কর্তৃক নির্ধারিত আইনের বাইরে নিজেদের আইন ঘোষণা করা এবং তা মানা কতটা যৌক্তিক? সাধারণত মসজিদে অজু অবস্থায় প্রবেশ করতে হয়। এখানে কেউ ইচ্ছাকৃতভাবে অজু ছাড়া প্রবেশ করেন না। আর অজু ভঙ্গের যতগুলো কারণ আছে, তারমধ্যে একটি হলো ঘুমিয়ে পড়া। এক্ষেত্রে বিনাঅজুতে মসজিদে অবস্থান করাটা কী আদৌ কোন সত্যিকারের ঈমানদারের পক্ষে সম্ভব?

ইসলামের মুলনীতির সাথে তাবলীগ জামায়াতের মুলনীতির রয়েছে আকিদাগত বিস্তর পার্থক্য। আমরা জানি ইসলামের স্তম্ভ বা মুলনীতি হলো পাঁচটি। কালেমা, নামাজ, রোজা, হজ ও জাকাত। আর তাবলীগ জামায়াতের মূলনীতি হলো ছয়টি। যথা: (১) কালেমা, (২) নামাজ, (৩) ঈলম ও যিকির, (৪) একরামুল মুসলিমিন বা মুসলমানদের সহায়তা করা, (৫) সহিহ নিয়ত বা বিশুদ্ধ মনোবাঞ্জা এবং (৬) তাবলীগ বা ইসলামের দাওয়াত। এখানে ইসলামের মুলনীতি হতে রোজা, হজ, জাকাত বাদ দিয়ে নিজেদের মত করে আরো নতুন চারটি মুলনীতি ঈলম ও যিকির, একরামুল মুসলিমিন বা মুসলমানদের সহায়তা করা, সহিহ নিয়ত বা বিশুদ্ধ মনোবাঞ্জা এবং তাবলীগ বা ইসলামের দাওয়াত সংযোজন করা হয়েছে। তারা এটাকে উছুল হিসেবে ব্যাখ্যা দিয়ে থাকেন। জানা দরকার, আছল একবচন এর বহুবচন হলো উছুল। আভিধানিক অর্থ একই অর্থাৎ ‘মুলনীতি’। ইসলামের মুলনীতির উপর বিশ্বাস রাখার পর তাবলীগের উদ্ভাবিত মুলনীতির উপর বিশ্বাস স্থাপন করা কী কোরআন-হাদিস সমর্থন করে? অবশ্যই করে না।
আল্লাহ পাক পবিত্র কোরআনের সূরা ‘আনআম’ এর ১৫৯নং আয়াতে এরশাদ করেন, “নিশ্চয়ই যারা স্বীয় ধর্মকে খন্ড-বিখন্ড করেছে এবং অনেক দলে হয়ে গেছে, তাদের সাথে আপনার কোন সম্পর্ক নাই। তাদের ব্যাপারে আল্লাহ তায়ালার নিকট সমর্পিত। অত:পর তিনি বলে দিবেন যা কিছু তারা করে থাকে”। অর্থাৎ ‘ধর্মে বিভেদ সৃষ্টি করা’ এবং ‘বিভিন্ন দলে বিভক্ত হওয়ার’ অর্থ ধর্মের মুল নীতিসমূহের অনুসরণ ছেড়ে স্বীয় ধ্যান ধারণা ও প্রবৃত্তি অনুযায়ী কিংবা শয়তানের ধোঁকা ও সন্দেহে লিপ্ত হয়ে ধর্মে কিছু নতুন বিষয় ঢুকিয়ে দেয়া অথবা কিছু বিষয় তা থেকে বাদ দেয়া’। রাসূলুল্লাহ সা. এ বিষয়টি বর্ণনা করে বলেন, বনী ইসরাঈলরা যে সব অবস্থার সম্মুখীন হয়েছিল, আমার উম্মতও সেগুলোর সম্মুখীন হবে। তাঁরা যেমন কর্মে লিপ্ত হয়েছিল আমার উম্মতও তেমনি হবে। বনী ইসরাঈলরা ৭২টি দলে বিভক্ত হয়েছিল, আমার উম্মতে ৭৩টি দল সৃষ্টি হবে। তারমধ্যে একদল ছাড়া সবাই দোজখে যাবে। সাহাবায়ে কেরাম আরজ করলেন, মুক্তিপ্রাপ্ত দল কোনটি? উত্তর হলো, যে দল আমার ও আমার সাহাবীদের পথ অনুসরণ করবে তারাই মুক্তি পাবে। (তাফসীরে মারেফুল কোরআন, পৃষ্ঠা:৪২৫)।

মসজিদ যেহেতু আল্লাহর ঘর এবং এর নিয়ম কানুন আল্লাহর দেয়া সেহেতু আমাদের উচিত তা পালন করা। ইসলাম সবচেয়ে সহজ ধর্ম। এ ধর্মে কোন জোর-জবরদস্তি করা হয় নাই। আমরা যদি কেউ নানান ওজরের কারণে জামাতে ফরজ নামাজ আদায় করতে না পারি, সেক্ষেত্রেও কিন্তু ইসলাম ধর্ম আমাদের জন্য মসজিদের দরজা বন্ধ করে নাই। সুস্পষ্টভাবে বলা হয়েছে, এসময় মুসুল্লীরা মসজিদে প্রবেশ করবে, যে যার মত করে একা একা নামাজ পড়বে। কেউই শব্দ করে পড়বে না। কারণ, কারো উচ্চস্বরের কারণে যাতে অন্যের নামাজে ব্যাঘাত না ঘটে। এটাই আল্লাহর আইন। কোরআন শরীফে আল্লাহ পাক বলেন, “মসজিদে যদি কোন ব্যক্তি নামাজে অথবা জিকিরে থাকে, যদি কেহ উক্ত ব্যক্তির নামাজ অথবা জিকিরকে বাধাগ্রস্ত করে, আল্লাহ বলেন, তার চেয়ে বড় জালেম আর কে আছে।” মসজিদে নামাজরত ব্যক্তি থাকলে এ সময় আল্লাহর কাছে সবচেয়ে প্রিয় নফল ইবাদত কোরআন শরীফও উচ্চস্বরে তিলাওয়াত করা নিষিদ্ধ। দেখা যায় তাবলীগ জামায়াতের অনুসারীরা নিজেদের নামাজ শেষ করেই বয়ান শুরু করে। এ সময় অনেক মুসুল্লী নামাজরত অবস্থায় থাকলেও সেদিকে তারা ভ্রুক্ষেপ করেন না। তাবলীগের বয়ান যদি নফলও হয়ে থাকে, তাহলে ঐ নফল দিয়ে ফরজকে ব্যাঘাত সৃষ্টি করাটা মারাত্মক অপরাধ।

ইসলামে নিজের ‘মত’ ও ‘পথ’এর কোন অস্থিত্ব নেই। এ প্রসঙ্গে তাফসীরে মাযহারীর কুফর ও ঈমানের সংজ্ঞা দিতে গিয়ে বলা হয়েছে, “সাহাবীগণের ঈমানের পরিপন্থী কোন বিশ্বাসের কোন নতুন পথ ও মত তৈরি করে সে মতের অনুসারী হয় এবং নিজেকে মুমিন দাবি করে, মুসলমানদের নামাজ রোজা ইত্যাদিতে শরীকও হয়, কিন্তু যতক্ষণ পর্যন্ত কোরআনের প্রদর্শিত পথে ঈমান আনায়ন না করে, ততক্ষণ পর্যন্ত কোরআনের পরিভাষায় তাদেরকে মুমিন বলা হবে না।” এখানে আরো একটা বিষয় গুরুত্বপূর্ণ তা হল, আমরা যদি পবিত্র কোরআন শরীফের সকল আয়াতের মধ্যে যদি একটি আয়াত না মানি বা বিশ্বাস না করি তাহলে আমাদের ঈমান থাকবে না। এক্ষেত্রে আমাদের অবস্থান হবে পথভ্রষ্টদের কাতারে।

পবিত্র কোরআন আল্লাহ এরশাদ করেন, “আল্লাজিনা আন আমাল্লাহু আলাইহিম মিনান্নাবীঈনা ওয়াসসদেক্বিনা ওয়াস সূহাতা ই ওয়াসসলেহিনা” অর্থাৎ “যাদের প্রতি আল্লাহ পাক অনুগ্রহ করেছেন, তাঁরা হচ্ছেন নবী, সিদ্দিক, শহীদ এবং সৎকর্মশীল সালেহীন”। আল্লাহর দরবারে মকবুল উপরোক্ত লোকদের মধ্যে সর্বোচ্চ স্তর নবীগণের। অত:পর নবীগণের উম্মতের মধ্যে যাঁরা সর্বোচ্চ সম্মানের অধিকারী, তাঁরা হলেন সিদ্দীক। যাঁদের মধ্যে রূহানী কামালিয়াত পরিপূর্ণতা রয়েছে। সাধারণ ভাষায় তাঁদেরকে বলা হয় আওলিয়া। আরা যাঁরা দ্বীনের প্রয়োজনে স্বীয় জীবনকে উৎসর্গ করেছেন, তাঁদেরকে বলা হয় শহীদ। আর সালেহীন হচ্ছেন, যারা ফরজ, সুন্নত, ওয়াজিব, মুস্তাহাব, নফল প্রভৃতি সর্বক্ষেত্রে শরীয়তের পুরোপুরি অনুসরণকারী ও আমলকারী সাধারণ পরিভাষায় তাঁদেরকে দ্বীনদার বলা হয়” (সূরা:নিসা, আয়াত:৬৯)। সুতরাং আমাদের বিশ্বাস থাকতে হবে কোরআনে সকল আয়াতের প্রতি। এর ব্যতিক্রম হলে আমাদের ঈমানের কী অবস্থা হবে তা সহজেই অনুমেয়।

সাহাবা আযমাঈনগণ, তাবেঈনগণ, তাবে-তাবেঈনগণ এমন কী ইতিহাস প্রসিদ্ধ আওলিয়াগণ যদি এমন চিল্লা পদ্ধতি চালু করতেন তাহলে বোধ হয় কারো ৪০ দিন, কারো ৬০ দিন, কারো ৩০ দিন, কারো আবার ২০ দিন এমনি করে ইসলাম সঠিক পথ থেকে ছিটকে পড়ে শুধুমাত্র যে চিল্লা জটে পড়তে হতো সমগ্র মুসলিম উম্মাহকে তাতে কোন সন্দেহ নেই।

নবী করীম সা. বিদায় হজের খুৎবাহ শেষ হওয়ার সাথে সাথেই কুরআনের শেষ আয়াত নাজিল হয়। “হে মোহাম্মদ আজ আমি তোমার দ্বীনকে সম্পূর্ণ করলাম এবং তোমার উপর আমার নিয়ামতকে পূর্ণ করে দিলাম। ইসলামকে তোমাদের জন্য জীবন বিধানরূপে মনোনীত করলাম।

আল্লাহ বলেন, “অত:পর সত্যের পর ভ্রষ্টতা ছাড়া কী থাকে?” (সূরা:ইউনুস, আয়াত : ৩২) অর্থাৎ, ইসলাম পূর্ণতা লাভ করার পর ইসলামের নামে দ্বীনের মধ্যে যা কিছু সংযোজিত, আবিস্কৃত ও প্রচলিত হবে সব কিছুই ভ্রান্ত বলে প্রত্যাখ্যাত হবে।

আল্লাহ তাআলা অন্যত্র বলেন, “আমি এ কিতাবে কোন কিছু বাদ রাখিনি।” (সূরা আনআম, আয়াত:৩৮) অর্থাৎ, আল্লাহ তাআলা কুরআনুল কারীমে সব কিছু যখন বলে দিয়েছেন তখন ধর্মে নতুন কোন বিষয় সংযোজন বা বিয়োজন করার প্রয়োজন নেই। যে কোন ধরনের সংযোজন ও বিয়োজনই বাতিল বিদয়াত বলে গণ্য হবে।

আল্লাহ তাআলা আরও বলেন, “অত:পর কোন বিষয়ে যদি তোমরা মতবিরোধ কর তাহলে তা আল্লাহ ও রাসূলের দিকে প্রত্যার্পণ করাও।” (সূরা নিসা, আয়াত:৫৯)। অর্থাৎ, যখন কোন বিষয়ে মত বিরোধ সৃষ্টি হবে তখন তার সমাধান আল্লাহ তাআলার কিতাব কুরআনুল কারীম ও রাসূলুল্লাহ সা. এর হাদীসে খুঁজতে হবে। আল্লাহর বিধানে সমাধান না খুঁজে নিজেদের পক্ষ থেকে যুক্তি দিয়ে কোন বিষয়ে সংযোজন ও বিয়োজন করা যাবে না। কুরআন-সুন্নাহর মূল ধারার বাইরে কোন ব্যাখ্যা দাঁড় করানো যাবে না।

দ্বীনের ব্যাপারে সকল প্রকার বিদয়াতই গোমরাহী। এ প্রসঙ্গে রাসুল সা. বলেছেন, “তোমরা দ্বীনের মাঝে নতুন বিষয় আবিস্কার করা থেকে বিরত থাকবে, কেননা, প্রত্যেক নতুন বিষয়ই বিদয়াত। আর প্রতিটি বিদয়াতের পরিণাম গোমরাহী বা ভ্রষ্টতা।” তিনি আরো বলেন, “যে ব্যক্তি আমার দ্বীনের মধ্যে এমন নতুন বিষয় তৈরি করবে, যা তার অর্ন্তভূক্ত নয়, তা প্রত্যাখ্যত হবে।” নবীজি আরো বলেছেন, “যে ব্যক্তি এমন কোন আমল করবে, যার মধ্যে আমার আদেশ নেই, তা আমলকারীর উপর প্রত্যাখ্যত হবে।”
মাওলানা মোহাম্মদ ইলিয়াস (র.) মালফুজাত বইয়ে লিখেছেন, মুসলমান ২ প্রকার। এক. যাঁরা তাবলীগ করে, আর দুই. যাঁরা তাদের সাহায্য করে। স্বভাবতই প্রশ্ন জাগে, তাঁর আবিস্কৃত এই পদ্ধতিগত তাবলীগ শুরুর আগে যারা মুসলমান ছিলেন, তাঁরা কী মুসলমান ছিলেন না? এমনকি উনার পিতা, পিতামহসহ পূর্ব পুরুষরা কয়দিনের চিল্লায় মুসলমান হয়েছিলেন?

আমাদের মনে রাখতে হবে, পবিত্র কোরান ‘থিউরিক্যাল’, আর নবীজী সা. হলেন প্র্যাকটিক্যাল। কোরানের রূপ নবী স. উপর নিপতিত। আমাদের প্রত্যেকটি আমল করতে হবে নবীজীর সুরতে। এই বাইরে সকল আমল পথভ্রষ্টতার নামান্তর। মহান আল্লাহ সবাইকে সহিহ বুঝ দান করুন। আমিন। মাহমুদ, লেখক সাংবাদিক, কবি ও কলামিষ্ট।

Share on Facebook
নিউজটি 205 বার পড়া হয়েছে

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

সর্বশেষ সংবাদ

16129961_1730814400566375_1235166755_o