Close

উখিয়ায় রোহিঙ্গা গর্ভবতী নারী ও শিশুর চরম স্বাস্থ্য ঝুঁকির আশংকা

২দিনের থেমে থেমে বৃষ্টি ও ঠান্ডা বিরূপ আবহাওয়ার ফলে রোহিঙ্গা ক্যাম্পে স্বাস্থ্য ঝুকিতে রয়েছে গর্ভবতী নারী ও শিশুরা। মিয়ানমার সেনা বাহিনী ও বর্ডার গাড (বিজিপি)এবং রাখাইন উগ্রবাদীদের হাতে নির্যাতনের মূখে এখনো পালিয়ে আসছে রোহিঙ্গারা। পৃথিবীর ইতিহাসে সবচেয়ে নির্যাতিত জনগোষ্ঠী নাম রোহিঙ্গা। মানবতা ও মনুষত্ব্যবোধের লেশমাত্রও নেই মিয়ানমারের। মিয়ানমার রাখাইন রাজ্যের সহিংসতা শুথেকে আজ পর্যেন্ত অনুপ্রবেশ থামেনি। গত ১সপ্তাহে প্রায় ৬০হাজারের অধিক রোহিঙ্গা বাংলাদেশে এসেছে। সেনা অভিযানের প্রেক্ষাপটে গত ২৫ অগাস্টের পর থেকে বাংলাদেশ সীমান্তে রোহিঙ্গা শরণার্থীদের ঢল চলছে। মিয়ানমারের সেনাবাহিনীর চরম ও নিষ্টুর নির্যাতনের শিকার হয়ে প্রাণের ভয়ে পালিয়ে বাংলাদেশে আশ্রয় নেওয়া রোহিঙ্গা শরণার্থীদের মারাত্বক স্বাস্থ্য ঝুঁকি দেখা দিয়েছে। কক্সবাজারের উখিয়া ও টেকনাফে গড়ে উঠা নতুন রোহিঙ্গা বস্তিতে নানা রোগ সহ মারাত্বক রোগ ছড়িয়ে পড়েছে।

রোহিঙ্গা ক্যাম্পে অনেক নারী বিভিন্ন সহায়তায় মেডিকেল ক্যাম্প ও স্থানীয় হাসপাতালে চিকিৎসা করাতে পারলেও অধিকাংশকেই বঞ্চিত থাকতে হচ্ছে। যারা অনাগত ভবিষ্যত নিয়ে অনবরত ঝরিয়ে যাচ্ছেন চোখের পানি। রোহিঙ্গা শরনার্থী নারী ও শিশুদের জীবননাশের আশংকা বাড়ছে দিন দিন। একই সাথে অপরিচ্ছন্ন পরিবেশ হওয়ায় নবজাতকদের মধ্যে নিউমোনিয়া ও জীবাণু সংক্রমণের প্রাদুর্ভাব দেখা দিয়েছে।

মিয়ানমার সেনাবাহিনীর অভিযান ও স্থানীয় সন্ত্রাসীদের হামলায় রাখাইন থেকে পালিয়ে আসা গর্ভবতী ও শিশুদের পরিস্থিতি ভয়াবহ। পালানোর সময় পথেই অনেক নারী সন্তান প্রসব করছেন। জিরো পয়েন্ট ছাড়াও অনেকে পাহাড়ের জঙ্গলে সন্তান জন্ম দিয়েছেন।

গর্ভকালে নারীদের শারীরিক ও মানসিক পরিবর্তন ঘটে। এ সময়ে অন্তঃসত্ত্বা মায়েদের প্রয়োজন বিশেষ যতœ। বিরত রাখা হয় সব ধরনের কষ্টক্লেশ থেকে। রাখা হয় উন্নত পরিচর্যায়। মা-বাবার চোখে মুখে কতো স্বপ্ন থাকে সদ্য ভূমিষ্ঠ সন্তানকে নিয়ে। সদ্য ভূমিষ্ঠ সন্তানের মুখ দেখা পরম আনন্দের মুহূর্ত মা-বাবার জন্য। অবচেতন মনে বুকটা স্ফীত হয় তাদের। গর্ভাবস্থা হচ্ছে একজন নারীর স্বাভাবিক শারীরিক প্রক্রিয়া মাত্র। তবে যেহেতু এই সময়ে নারীর শরীরের ভেতরে আরেকটি মানবশিশু বেড়ে ওঠে এবং সেই শিশুটির খাবার জোগান মায়ের শরীর থেকেই হয়ে থাকে, এ জন্য মাকে সাধারণ সময়ের চেয়ে কিছুটা বেশি খাবার খেতে হবে। এ খাবারগুলো হবে প্রথমত সুষম খাবার। তবে যেহেতু এ অবস্থায় শরীরে লৌহ ও ক্যালসিয়ামের প্রয়োজন আছে, তাই এ দুটি উপাদানসমৃদ্ধ খাবার বেশি খেতে হবে। রোহিঙ্গা নারী এ যতœ পাচ্ছেন না।

কুতুপালং ক্যাম্প বাজারের পল্লী চিকিৎসক জাফর আলম ডিপো জানান, মিয়ানমার থেকে পালিয়ে আসা রোহিঙ্গা নারীদের মধ্যে বেশির ভাগ শারিরিক ভাবে দুর্বল, মানষিক বিপর্যস্থ। গর্ভাবস্থায় মানসিক নির্যাতন সেই মায়ের শরীরে ও মনে নেতিবাচক প্রভাব ফেলে। এর ফলে অনেক ক্ষেত্রে গর্ভপাত হতে পারে। আবার কখনো কখনো মানসিক চাপের কারণে অন্তঃসত্ত্বা নারীর রক্তক্ষরণ হতে পারে বা অকাল প্রসব হয়ে যেতে পারে। তাই অন্তঃসত্ত্বা নারীর জন্য একদিকে যেমন প্রয়োজন শারীরিক সুস্থতা তেমনি প্রয়োজন মানসিক সুস্থতাও।

মিয়ানমার থেকে পালিয়ে বাংলাদেশের কক্সবাজারে আশ্রয় নেওয়া রোহিঙ্গার মধ্যে দুই লাখের বেশি শিশু। মারাত্মক স্বাস্থ্য ঝুঁকিতে রয়েছে এই শিশু সন্তান। মিয়ানমারে সেনা কর্তৃক নৃশংস নির্যাতনের কথা স্বীকার করে নারী নুর বেগম (২২) জানান, আমাদের অঞ্চলে এমন নারী নেই যারা তাদের হাতে নির্যাতিত হয়নি। ওরা কাউকেই ছাড়ছে না। প্রথমে বাড়িতে এসে পুরুষকে ধরে নিয়ে যায় তারপর নারীদের প্রকাশ্যেই নির্যাতন চালায়। এক নারীকে একাধিক সেনা নির্যাতন চালায় বলেও জানান তিনি। সে বলেন, এক বাড়িতে সেনারা এসে কিশোরীকে প্রথমেই ধর্ষণ করে। তার বাবা মেয়েটিকে বাঁচাতে চাইলে তাকে ধরে নিয়ে যায়। যাদের ধরে নিয়ে যাওয়া হয় তারা আর কখনো ফিরে আসে না।

কুতুপালং শরণার্থী শিবিরে আসা আক্রান্ত নারীদের অনেকেই আত্মীয় সজনের মাধ্যমে উখিয়ার এমএসএফ হাসপাতালে ভর্তি হয়। এখানে তারা প্রাথমিক সহায়তা পাচ্ছেন। চিকিৎসা সহায়তা পাওয়া অনেকের রিপোর্ট কার্ডে দেখা গেছে তারা শারীরীক ও মানসিকভাবে ভারসাম্য হারিয়ে ফেলেছেন। ভবিষ্যতে এই নারীরা কোনো কাজ করতে পারবেন কিনা সন্দেহ রয়েছে।
মিয়ানমার থেকে স্বামী ও পরিবারের সঙ্গে অজানা গন্তব্যে পা বাড়ান ৬ মাসের অন্তঃসত্ত্বা রাজুমা বেগম (১৮) । অবশেষে পাহাড়-জঙ্গল ডিঙিয়ে সীমান্ত পার হয়ে বাংলাদেশের উখিয়ার কুতুপালং লম্বাশিয়া পাহাড়ে আশ্রয় নেন।

মিয়ানমার সেনাবাহিনীর নির্যাতনে দেশ ছেড়ে পালিয়ে আসার বেদনা, অপরদিকে সন্তান প্রসব যন্ত্রণা। উভয়ের মাঝে অসহায়-অস্থির হাছিনা বেগম। পাশে ছিলেন স্বামী আর জ্যা মর্জিনা বেগম। বাংলাদেশ ভূখ-ের নাফের কাদামাটিতে সন্তান প্রসব করেন হাছিনা। কোনোরকম চিকিৎসা সহায়তা ছাড়া বাংলাদেশ-মিয়ানমারের নোম্যান্সল্যান্ডে শতাধিক নবজাতকের জন্ম হয়েছে। এ ছাড়াও আশ্রয় নেয়া সীমান্তের বিভিন্ন এলাকায় জন্ম হয়েছে অসংখ্য শিশুর। এমনকি পারাপারের সময় নৌ-যানেও অনেকেই সন্তান প্রসব করেছেন। যাদের শারীরিক অবস্থা অত্যন্ত শোচনীয় বলে জানা গেছে।

জাতিসংঘ সংস্থার শিশু সুরক্ষা বিভাগের প্রধান জ্যঁ লিবিকে উদ্ধৃত এক বিবৃতিতে বলেছেন “এই মানবিক সঙ্কট ক্রমশ বড় আকার ধারণ করছে। আর এই সঙ্কটে সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে আছে শিশুরা। প্রাথমিক তথ্য অনুযায়ী, শরণার্থীদের মোট সংখ্যার ৬০ শতাংশই শিশু।” “এই শিশুরা এখনও ট্রমার মধ্যে দিয়ে যাচ্ছে। তাদের নিরাপত্তা প্রয়োজন, সেই সঙ্গে প্রয়োজন মানসিক সহায়তা। আমরা দেখেছি, ক্যাম্পগুলোতে অনেক অন্তঃসত্ত্বা নারী রয়েছেন। বাংলাদেশে আসার পথেই অনেক মা সন্তান প্রসব করেছেন,” বলা হয় বিবৃতিতে।

দুই লাখের বেশি রোহিঙ্গা শিশুর জন্য জরুরি সহায়তা প্রয়োজন । শরণার্থী শিবিরগুলো প্রতিদিনই বড় হচ্ছে এবং সেখানে সুপেয় পানি ও পয়নিষ্কাশনের ব্যবস্থা করা কঠিন হয়ে পড়ছে। বহু নারী, শিশু ও বৃদ্ধ অল্প জায়গার মধ্যে অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে থাকতে বাধ্য হচ্ছে। এরকম পরিস্থিতিতে ক্যাম্পের শিশুরা পানিবাহিত রোগের মারাত্মক ঝুঁকিতে রয়েছে। ডাক্তার জাফর আলম ডিপো আরো জানান, মিয়ানমারের আক্রান্ত হওয়া শতাধিক নারীকে আমরা চিকিৎসা দিয়েছি। যাদের বেশিরভাগ যৌন নির্যাতনের শিকার। এরা চরম শারীরীক ও মানসিক যন্ত্রণার শিকার বলেও জানান তিনি। গর্ভবতী রোহিঙ্গা শরনার্থী নারী ও শিশুদের জীবননাশের আশংকা বাড়ছে দিন দিন। একই সাথে অপরিচ্ছন্ন পরিবেশ হওয়ায় নবজাতকদের মধ্যে নিউমোনিয়া ও জীবাণু সংক্রমণের প্রাদুর্ভাব দেখা দিয়েছে।

কক্সবাজারের সিভিল সার্জন ডা. আব্দুস সালাম জানিয়েছেন, সংক্রমণ এড়াতে ৫ বছরের কম বয়সের রোহিঙ্গা শিশুদের প্রয়োজনীয় টিকা দেবে স্থানীয় প্রশাসন। শুধু ৫ নয়, ১৫ বছরের নিচে সকলকেই হামের টিকা দেয়া হবে। পাশাপাশি অন্যান্য রোগেরও টিকাও দেয়া হবে।’ ইতিমধ্যে ৯লাখ রোহিঙ্গাকে কলেরা ভ্যাকসিন দেওয়া আরম্ভ হয়েছে। এদিকে রোহিঙ্গা শরণার্থী ক্যাম্পের এইচআইভি পজেটিভ ১৯ রোহিঙ্গা শনাক্ত করা হয়েছে। তৎমধ্যে ১জন মারা গেছে। এই সংক্রামক রোগ নিয়ে তবে কোন প্রকার ঝুকি নেই বলে জানিয়েছেন তিনি। তিনি এসময় আরো বলেন, সরকার এই পরিস্থিতি মোকাবিলায় কাজ করছে। রোহিঙ্গাদের জন্য ৩৬টি মেডিক্যাল টিম কাজ করছে। ক্যাম্পগুলোতে এক লাখ ২০ হাজার হামের টিকা, ৪০ হাজার পোলিও ভ্যাকসিন, ৩৮ হাজার ভিটামিন ট্যাবলেট বোতল বিতরণ করা হচ্ছে।

রোহিঙ্গাদের প্রতি মিয়ানমারের অব্যাহত নিপীড়ন এবং দেশত্যাগের ফলে সবচাইতে বেশি ঝুঁকির মধ্যে পড়িয়াছে শিশু ও নারীরা। এখন অবধি প্রায় এক হাজার ১২৮টি পরিবার-বিচ্ছিন্ন শিশুর সন্ধান পাওয়া গেছে। শরণার্থীর সংখ্যা বৃদ্ধির সহিত পাল্ল দিয়া প্রতিনিয়ত বৃদ্ধি পাচ্ছে এই সংখ্যা।

তবে শিবিরগুলোতে স্বাস্থ্যকর পরিবেশ রক্ষা করা না গেলে রোগজীবাণুর প্রাদুর্ভাব আরো বাড়বে বলে জানান সংশ্লিষ্ঠরা। বড় ধরনের স্বাস্থ্য ঝুঁকি এড়াতে ক্যাম্পগুলোতে সুপেয় পানি ও পয়ঃনিষ্কাশনের ব্যবস্থা করা দরকার।

বর্তমান পরিস্থিতিতে রোহিঙ্গা বৃদ্ধ, শিশু ও নারীরা পানিবাহিত রোগের ঝুঁকিতে রয়েছে সবচাইতে বেশি। স্পষ্টতই বিপুল পরিমাণ এই শরণার্থীর ঢল সামলাইতে হিমশিম খাচ্ছে স্থানীয় প্রশাসন। সার্বিকভাবে বড় ধরনের স্বাস্থ্যঝুঁকি এড়াতে ক্যাম্পগুলিতে সুপেয় পানি ও পয়ঃনিষ্কাশনের ব্যবস্থা করা প্রয়োজন। প্রয়োজন উচ্চমানের পুষ্টিসমৃদ্ধ খাবার। মানবিক দিক বিবেচনায় বাংলাদেশ সর্বাত্মক সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দিয়েছে রোহিঙ্গা শরণার্থীদের প্রতি। তাহাদের প্রতি মানবিক ভূমিকা পালনের সুযোগ ও দায়িত্ব রহিয়াছে বিশ্বের শান্তিপ্রিয় ও কল্যাণকারী রাষ্ট্রসমূহেরও।

Share on Facebook
নিউজটি 256 বার পড়া হয়েছে

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

সর্বশেষ সংবাদ

16129961_1730814400566375_1235166755_o